‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’ ।। বিশেষ কলাম।।

24
অাজ ২০শে আগস্ট, শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের ৪৮ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী।  স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয় ও প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখার জন্য দুঃসাহসী এক ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
শহীদ মতিউর রহমান, মানুষটি ছিলেন পা থেকে মাথা পর্যন্ত খাঁটি দেশপ্রেমিক । স্ত্রী মিলি রহমান, মাহিন ও তুহিন নামের দুই শিশুকন্যা এবং আত্মীয় স্বজন সব ভুলে দেশের জন্য তিনি জীবন দিয়েছিলেন।
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দাফন হয়েছিলো পাকিস্তান করাচির মাসরুর বেসের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কবরস্থানে। তাঁর সমাধির সামনে লেখা ছিলো- ‘ইধার শো রাহা হ্যায় এক গাদ্দার’। প্রায় ৩৫ বছর ওখানে ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান।
১৯৭১ সালের শুরুতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে, শহীদ মতিউর রহমান সপরিবারে দুই মাসের ছুটিতে আসেন ঢাকায়৷ ২৫ মার্চের কালরাতের পর মতিউর রহমান, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খুললেন ৷ যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন ৷ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তুললেন একটি প্রতিরোধ বাহিনী ৷ ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানী বিমান বাহিনী ‘স্যাভর জেট ‘ বিমান থেকে তাঁদের ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে ৷ শহীদ মতিউর রহমান পূর্বেই এটি আশঙ্কা করেছিলেন ৷ তাই ঘাঁটি পরিবর্তনের কারণে ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তাঁর বাহিনী ৷
এরপর ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকা আসেন ও ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান ৷ ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট শুক্রবার ফ্লাইট শিডিউল অনুযায়ী মিনহাজের উড্ডয়নের দিন ছিলো ৷ শহীদ মতিউর রহমান, পূর্ব পরিকল্পনা মতো অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে ৷ সামনে পিছনে দুই সিটের প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩ । রশিদ মিনহাজ বিমানের সামনের সিটে বসে স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসতেই তাকে অজ্ঞান করে ফেলে বিমানের পেছনের সিটে লাফিয়ে উঠে বসলেন৷ কিন্তু জ্ঞান হারাবার আগে মিনহাজ বলে ফেলেছিল, বিমানটি হাইজ্যাকড হয়েছে । ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার শুনতে পেল তা ৷ বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতিউর বিমান নিয়ে ছুটে চললেন৷ রাডার ফাঁকি দেবার জন্য নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে অনেক নিচুতে বিমান চালাচ্ছিলেন তিনি ৷
চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। এ সময় রশীদের জ্ঞান ফিরে এলে, তার সাথে শহীদ মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রশীদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে তিনি বিমান থেকে ছিটকে পড়েন এবং মিনহাজ রশীদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। সাথে প্যারাসুট না থাকাতে তিনি শহীদ হন মতিউর রহমান।
এরপর পাকিস্তানে অবস্থানরত, বিশেষ করে পাকিস্তানের বিমান বাহিনীতে কর্মরত বাঙালিদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। পাকিস্তানিরা বাঙালি অফিসার ও কর্মচারীদের দেখলে বিদ্রুপ এবং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলতো। কেউ কেউ মুখ খিস্তি করেও গালি দিত।
এমন অবস্থায় পাকিস্তানের প্রতি একান্ত অনুগত বাঙালি অফিসার উইং কমান্ডার সাইদ আহমেদ বেগ পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধানের বাণী নিয়ে উপস্থিত হল। করাচির ড্রিগরোড বিমানঘাঁটির সকল বাঙালি অফিসার এবং কর্মচারী একত্রিত করে দারুণ এক বক্তৃতা রাখলো। তার সার বক্তব্য ছিল , ‘ভাইসব, আমাদের বাঙালিদের উচিত পাকিস্তান নামক রষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকা। মতিউর রহমানের মত বিশ্বাসঘাতকতা না করে পাকিস্তানের প্রতি যাদের আনুগত্য নেই তাদের উচিত হবে বিমানবাহিনী থেকে পদত্যাগ করা’ । পাকিস্তান-প্রেমিক উইং কমান্ডারের বক্তব্য শুনে বেশিরভাগ বাঙালি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মনে যথেষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলেও কেউ তা প্রকাশ করতে সাহসী হলেন না। সবাই চুপ করে রইলেন। শুধুমাত্র এক জন ছিলেন এর ব্যতিক্রম।
সাইদ আহমেদের বক্তব্য শেষ হলে, হালকা পাতলা গড়নের চুপচাপ স্বভাবের মানুষ ফ্লাইং অফিসার ওয়ালীউল্লাহ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “Sir, I owe my allegiance to Bangladesh and not to Pakistan. I want to resign from my service.” পরের দিনই তিনি চাকুরি থেকে পদত্যাগ করলেন।ফ্লাইং অফিসার ওয়ালীউল্লার সাহস দেখে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। বর্তমান অবস্থায় চিন্তাও করা সম্ভব না যে, একাত্তর সালে পাকিস্তানে অবস্থান করে সমবেত জনতার সামনে কোনো বাঙালি অফিসার বলতে পারে, “I owe my allegiance to Bangladesh and not to Pakistan. “
পাকিস্তানের ঘাঁটিতে বসে এমন সাহসী উচ্চারণকারী বীরকে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা কতটকু সম্মান দিয়েছি বা তাঁকে আমরা ক’জন জানি? বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে কেবল উইং কমান্ডার পদপ্রাপ্ত হয়ে তিনি অবসর গ্রহন করেন।
পাকিস্তানের প্রতি একান্ত অনুগত, পদলেহনকারী এবং বীর শ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক বলে সম্বোধনকারী উইং কমান্ডার সাইদ আহমেদ বেগ বাংলাদেশে এসে বিমানবাহিনীতে গ্রুপ ক্যাপ্টেন পদমর্যাদায় উন্নিত হয়। তারপর বাংলাদেশ সরকারের পূর্ণ সেক্রেটারির পদমর্যাদায় পৌছে অবসর গ্রহন করেছিল।
শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ২৯ অক্টোবর ১৯৪১ সালে  পুরনো ঢাকার ১০৯, আগা সাদেক রোডে জন্মগ্রহণ করেন । তার বাবা মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মা সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন।
১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৩ সালে রিসালপুর পি,এ,এফ কলেজ থেকে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। কমিশন প্রাপ্ত হবার পর তিনি করাচির মৌরিপুর (বর্তমান মাসরুর) এয়ার বেজ এর ২ নম্বর স্কোয়াডরনে জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসাবে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি টি-৩৩ জেট বিমানের উপর কনভার্সন কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ৭৫.৬৬% নম্বর পেয়ে উর্ত্তীর্ণ হন।
২০০৬ সালের ২৩ জুন মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান হতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁকে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় ২৫শে জুন শহীদ বুদ্ধিজীবী গোরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়। শহীদ মতিউর রহমান, যে ভালবাসায় আপনি নিজ প্রান বিসর্জন দিয়েছেন, তা মনে রাখবে বাংলাদেশ ।
এম সাইফুল ইসলাম
সম্পাদক মধুমতি নিউজ