ঢাকা মেডিকেলের ২০ কোটি টাকার খরচের বিল তদন্ত হবে -প্রধানমন্ত্রী

29

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, বাজেট বাস্তবায়নে অতীতে আমরা ব্যর্থ হয়নি, ভবিষ্যতেও হবো না। সামনে যতই সঙ্কট আসুক, অওয়ামী লীগ সরকার শক্তহাতে তা মোকাবেলা করবে। যতই বাধা আসুক তা মোকাবেলা করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। দেশের কোন মানুষকে আমরা অভুক্ত থাকতে দেব না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুন:রুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে, এ ব্যাপারে কাউকে কোন ছাড় দেয়া হবে না। দুর্নীতির মুলোৎপাটন করেই আমরা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখবো, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আজ সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সমাপনি আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। দীর্ঘ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ, মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা সংসদে তুলে ধরেন।

এছাড়া সংসদ নেতা বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের এর বক্তব্যের জবাবে বলেন, ঢাকা মেডিকেলে ডাক্তার, নার্সদের খাওয়ার খরচের  হিসেবে ২০ কোটি টাকা অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমরাও এটা তদন্ত করে দেখছি। এতো অস্বাভাবিক কেন হবে। এটা স্বাভাবিকভাবেই অস্বাভাবিক মনে হয়। যদি কোন অনিয়ম হয় সেটাও ব্যবস্থা নেব। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এবং বিরোধী দলের উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের।
বৈশ্বিক অর্থনীতির মহামন্দা মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত: বৈশ্বিক অর্থনীতি মহামন্দা মোকাবেলায় সরকার প্রস্তুত রয়েছে জানিয়ে সংসদ নেতা বলেন, করোনা মহামারির কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি মহামন্দার দ্বারপ্রান্তে। জাতি একটি ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বব্যাপী এই সমস্যা। তবে দেশের সব ধরনের মানুষ যাতে উপকৃত হয় এজন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। এজন্য ইতোমধ্যে ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি করোনা ভাইরাসে মৃত্যুবরণকারী সবার আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বলেন, এই প্রাণঘাতী বৈশ্বিক মহামারির হাত থেকে দেশবাসী ও বিশ্ববাসী যেন মুক্তি পান। চিকিৎসাধীনরা যেন সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২০ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৪ দশমিক ৯ শতাংশ সংকুচিত হবে বলে প্রাক্কলন দিয়েছে। করোনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ১৯ কোটি ৫০ লাখ কর্মীর চাকরি হ্রাস, বৈশ্বিক এফডিআই প্রবাহ ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হ্রাস এবং বৈশ্বিক রেমিট্যান্স ২০ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ঘোষণা দিয়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে আমরা বাংলাদেশে একটি বাজেট প্রণয়ন করেছি। এই বাজেট প্রণয়ন অত্যন্ত কঠিন ও দুরুহ কাজ ছিল। এই বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে জড়িতদের ধন্যবাদ জানাই।
করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও জীবন জীবিকা রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে বাজেট দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে বলছেন বাজেট একটু বেশি আশাবাদী দেখানো হয়েছে। আমরা অবশ্যই আশাবাদী। সব সময় আমাদের একটা লক্ষ্য থাকতে হবে। তিনি বলেন, কোভিড-১৯ এর জন্য সবকিছু স্থবির। আমরা আশাকরি, সব সময় আমরা আশাবাদী যে, এই অবস্থা থাকবে না, এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটবে। যদি হঠাৎ উত্তরণ ঘটে আগামীতে আমরা কি করব সেটা চিন্তা করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছি। এরইমধ্যে আমরা প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। এই ১৯টি প্যাকেজ সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত যখন হবে তখন ১২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ সুবিধা পাবে। এছাড়া প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ কর্মসুরক্ষা ও নতুন কর্মসৃজন হবে। বাজেট প্রস্তাবনায় যেসকল বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তা উল্লেখ করে সংসদ নেতা বলেন, সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ অর্জন করব বলে নির্ধারণ করেছিলাম। প্রথম ৮ মাসে আমরা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অর্জনও করেছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়াতে সেটা কমে যায় এবং সংশোধন করতে বাধ্য হই। যেটা এখন ৫ দশমিক ২ শতাংশ ধার্য্য করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালে বিশ্ব এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি কোভিড-১৯ এর প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে আসবে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের অর্থনীতি পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসবে ধরে নিয়েই আগামী ২০২০-২০২১ অর্থ বছরের বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ।  একই সময় নিম্ন মূল্যস্ফীতি ধরে রাখার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতি বজায় রাখার  ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। সেজন্যই আমরা উচ্চাবিলাসী বাজেটই দিয়েছি। দিয়েছি এই জন্য যে, আমাদের তো একটা আকাক্সক্ষা আছে বাংলাদেশের মানুষকে নিয়ে। তাদের জীবন মান উন্নত করব।
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ২ শতাংশ প্রাক্কলন পূরণে চার দফা টার্গেট পূরণে গৃহীত কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, (ক) করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে আমাদের অর্থনীতির উৎপাদন ব্যাহত হলেও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর কোন ক্ষতি হয়নি, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যুদ্ধের সময় সাধারণত হয়ে থাকে। (খ) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কর্মসৃজন ও ব্যক্তি আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে এবং প্রণোদনা প্যাকেজ সমূহ সুষ্ঠু বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা মহামারীর পূর্বাবস্থায় চলে আসবে। (গ) অক্টোবর বা নভেম্বর মাসের মধ্যে করোনা ভাইরাস প্রতিষেধক টিকা বাজারে চলে আসলে ইউরোপ-আমেরিকায় জীবনযাত্রা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাবে, আমাদের রপ্তানী আয় কোভিড-১৯ পূর্ববর্র্তী অবস্থায় আবার ফিরে যাবে এবং সবশেষ (ঘ) বিশ্ব বাজারে জ্বালানী তেলের মূল্য খুব কমে গিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা আশাবাদী এর ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রবাস আয়ের বর্তমান সঙ্কটও কেটে যাবে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সরকারের চার দফা কর্মপন্থার বিষয়গুলো তুলে ধরে সংসদ নেতা বলেন, আমরা চারটি কৌশলগত কর্মপন্থা ঠিক করেছি। তা হচ্ছে (ক) সরকারি ব্যয় বৃদ্ধিকরণ, কর্মসৃজনকে প্রাধান্য দেওয়া বিলাসী ব্যয় নিরুৎসাহিত করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় পিছিয়ে দেয়া, (খ) আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ প্রণয়ন এবং (গ) সামাজিক সুরক্ষার আওতা বৃদ্ধিকরণ, (ঘ) বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি করা। শেখ হাসিনা বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অর্থনীতির প্রভাব কার্যকরীভাবে মোকাবেলা করার জন্য প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ  ঘোষণা করেছি।  প্রণোদনা প্যাকেজসমূহ বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে সুবিধা পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কিছু বিবেচনায় নিয়েই অর্থমন্ত্রী ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের এটি ১৭তম বাজেট, বর্তমান মেয়াদের দ্বিতীয় বাজেট। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনটি বাজেট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। কাজেই সব মিলিয়ে ২০টি বাজেট আওয়ামী লীগ সরকার এ দেশকে উপহার দিয়েছে। এই বাজেটে অর্থনীতি পুনর্গঠণ এবং করোনাভাইরাস মোকাবেলায় জীবন ও জীবিকা রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছি। তাছাড়া বর্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসৃজন এবং সামাজিক সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা এগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছি। অতীতের মতো এই বাজেটও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।