কভিড-১৯: নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে রোগটির প্রভাব ভিন্ন কেন?

41

করোনা ভাইরাস (সারস-কভ-২) সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য করে না। প্রধানমন্ত্রী থেকে পরিচারিকা, জীবনের সর্বস্তরের মানুষকে নির্বিচারে আক্রান্ত করে। তবে এর ফলে সৃষ্ট কভিড-১৯ রোগের ক্ষেত্রে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও লিঙ্গভেদে অনেক হেরফের দেখা গেছে। এর মধ্যে অন্যতম লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যতা। নারী ও পুরুষের মধ্যে রোগটির প্রভাবে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা দেখা গেছে। নারীদের তুলনায় পুরুষদের ক্ষেত্রে রোগটি বেশি জটিল আকার ধারণের হার বেশি। পুরুষদের মধ্যে এই রোগে মৃত্যুহারও বেশি। অন্যদিকে, নির্যাতন, বেকারত্ব বেশি দেখা গেছে নারীদের ক্ষেত্রে।

রোগটির এই ভিন্নতার কারণ ব্যাখ্যায় একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। মানবজমিনের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনটির সংক্ষিপ্ত অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

অসুস্থতায় ভিন্নতা
কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হওয়া নারী ও পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নতা দেখা গেছে মৃত্যুর হারে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের তুলনায় এই রোগে পুরুষদের মারা যাওয়ার হার দ্বিগুণ। একইভাবে পশ্চিম ইউরোপে রোগটিতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৬৯ শতাংশই পুরুষ। চীন ও অন্যান্য জায়গায়ও একই প্যাটার্ন দেখা গেছে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অ্যানা পুরডির নেতৃত্বে একদল গবেষক বিভিন্ন দেশে লিঙ্গভেদে করোনার প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। কেন এই ভিন্নতা তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট কারণ উদঘাটন করতে পারেননি তারা।
একটি তত্ত্ব হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইমিউনোলজি বিষয়ক অধ্যাপক ফিলিপ গৌলডার বলেন, টিকা ও সংক্রমণের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় নারীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সচরাচর বেশি আগ্রাসি হয়ে থাকে। এর একটি কারণ হচ্ছে, নারীদের এক্স ক্রোমোসোমের সংখ্যা দুটি ও পুরুষদের একটি। গৌলডার জানান, করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এই ক্রোমোসোমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, করোনার মতো ভাইরাসগুলোর উপস্থিতি শনাক্ত করে এক্স ক্রোমোসোমে থাকা প্রোটিনগুলো। নারীদের কোষে দুটি এক্স ক্রোমোসোম থাকায় এই প্রোটিন প্রতি কোষে পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণে নিঃসৃত হয়। যার ফলে, নারীদের দেহে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
আরেকটি সম্ভাবনা হচ্ছে, নারী-পুরুষের জীবনযাপনে ভিন্নতা। গৌলডার বলেন, নারী ও পুরুষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আচরণগত ভিন্নতা রয়েছে। যেমন, ধূমপানে হৃদরোগ, ফুসফুসে সমস্যা ও ক্যান্সাররের মতো রোগগুলোর জটিলতা বাড়ে। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের উপর এসব রোগ ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কিছু দেশে লিঙ্গভেদে ধূমপানের হারে ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। যেমন চীনে, ৫০ শতাংশ পুরুষ ধূমপান করে। অন্যদিকে নারীদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৫ শতাংশ।
কিন্তু করোনা মহামারির এ পর্যায়ে এখনো এটা নিশ্চিত নয় যে, বায়োলজিক্যাল বা আচরণগত কারণে নারী ও পুরুষ ভাইরাসটিতে ভিন্নভাবে আক্রান্ত হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ধাক্কায় বৈষম্য
করোনার সংক্রমণ রোধে বিশ্বজুড়ে দেশে দেশে জারি হয়েছে লকডাউন। বিঘ্নিত হয়েছে নিয়মিত কাজকর্ম। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক প্রতিষ্ঠান, কারখানা। এতে অনেকে জীবিকা উপার্জনের পথ হারিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাষ্ট্রে কেবল মার্চ মাসেই চাকরি হারিয়েছেন ১৪ লাখ মানুষ। এর মধ্যে পুরুষদের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন নারীরা। বেকারত্বের দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের হার বেড়েছে ০.৯ শতাংশ, অন্যদিকে পুরুষদের বেকারত্বের হার বেড়েছে ০.৭ শতাংশ।
সাধারণত অর্থনৈতিক মন্দায় বেকারত্বের হিসাবে, পুরুষরা নারীদের তুলনায় বেশি আক্রান্ত হন। এর কারণ হচ্ছে, এমন সময়ে অর্থনৈতিক চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি আক্রান্ত হয়, যেমন নির্মাণ কাজ বা পণ্য উৎপাদন। এসব কাজে সাধারণত পুরুষকর্মীর সংখ্যা বেশি থাকে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক চক্রের সঙ্গে কম সংশ্লিষ্ট খাতগুলোয় সাধারণত নারীদের প্রাধান্য থাকে। যেমন, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষা।
কিন্তু এইবার অন্য অনেক বিষয়ও মানুষের চাকরি হারানোর উপর প্রভাব ফেলছে। এর একটি হচ্ছে ‘আবশ্যক’ বা ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কর্মী। গবেষকরা স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহণ, সুরক্ষা খাত, খামার, বনায়ন, সংস্কার ইত্যাদি খাতের কর্মীদের করোনার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই হিসাবে, ১৭ শতাংশ কর্মজীবি নারী গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোয় কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৪ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে নারী ও পুরুষকর্মীদের উপর করোনার প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন জার্মানির মানহেইম ইউনিভার্সিটির অর্থনীতিবিদ মিশেল টারটিল্ট। তিনি জানান, ঘরে বসে কাজ করার পদ্ধতিও নারী ও পুরুষকর্মীদের কাজ হারানোর বিষয়টিকে প্রভাবিত করছে। টারটিল্ট ও তার সহকর্মীরা, যেসব কাজ ঘরে বসে টেলিযোগাযোগের মাধ্যমে করা যায় ও যেগুলো করা যায় না সেগুলোর একটি তালিকা করেছেন। যেমন, একজন বাণিজ্য বিশ্লেষক ঘরে বসে তার কাজ করতে পারলেও, একজন বারকর্মী তা পারবেন না।
টারটিল্টের হিসাব অনুযায়ী, ঘরে বসে করা যায় এমন কাজে নারীকর্মীর হার ২২ শতাংশ ও পুরুষদের হার ২৮ শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদে নারীরা বেশি ঝুঁকিতে
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নীতিমালা বিষয়ক অধ্যাপক ক্লেয়ার ওয়েনহাম বলেন, সকল মহামারিই লিঙ্গভেদে প্রভাব ফেলে। সমস্যা হচ্ছে, কেউ এ ব্যাপারে কথা বলে না। নীতিনির্ধারকরা এ ব্যাপারে সচেতনও না।
ওয়েনহাম ও তার সহকর্মীরা ঝিকা ও ইবোলা মহামারিতে নারী ও পুরুষদের উপর ভাইরাসগুলোর প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ইবোলার সময় সিয়েরা লিওনে নারীদের মধ্যে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এদিকে, করোনার সময় গৃহনির্যাতনের হারও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। লকডাউনের ফলে সবাই ঘরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ফ্রান্সে লকডাউনের প্রথম সপ্তাহে গৃহনির্যাতন বৃদ্ধি পায় পূর্বের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ, অস্ট্রেলিয়ায় বৃদ্ধি পায় ৭৫ শতাংশ ও লেবাননে তা দ্বিগুণ আকার ধারণ করেছে। নারী ও পুরুষ উভয়েই গৃহনির্যাতনের শিকার হতে পারেন। তবে নারীদের ক্ষেত্রে এই হার অত্যন্ত বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় দ্বিগুণ গৃহনির্যাতনের শিকার হতে পারেন বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। অন্যদিকে, পুরুষদের তুলনায় তাদের ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকি ১৪ গুণ বেশি।
করোনা ভাইরাসে পুরুষদের, বিশেষ করে বৃদ্ধ পুরুষদের তুলনামূলকভাবে নারীদের চেয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। তবে, নারীদের জন্য, যারা এই ভাইরাস থেকে সুস্থ হয়ে উঠবেন, তারা দীর্ঘমেয়াদে এই ভাইরাসের জন্য পুরুষদের তুলনায় বহুগুণে বেশি ভুগবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।