হঠাৎ খুমেক ও শেবাচিম হাসপাতলের দুই পরিচালকের রদবদল

গুঞ্জন উঠেছে সর্বমহলে

599

আবু হামজা বাঁধন, ডেক্স রিপোর্ট।
সারা দেশ করোনাভাইরাস সংক্রমনে আতংকিত। ইতিমধ্যে বাংলাদেশও নাম লিখিয়েছে করোনা রোগে মৃত্যুর তালিকায়। দেশের প্রতিটি সরকারি বে-সরকারি সংস্থা শংকিতভাবে প্রতিটি দিন পার করছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রনে রুটিন মাফিক সকাল সন্ধ্যা কাজ করছে। এছাড়া দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক সহ ডাক্তাররা করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রনে চ্যালেঞ্জিং ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। নিয়েছেন বিভিন্ন পরিকল্পনা। ঠিক তখনই খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল ও শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের দুই পরিচালককে বদলি করা হয়েছে। হঠাৎ বদলির কারণে কিছুটা হলেও এই দুটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবার কার্যক্রম ব্যহত হতে পারে বলে সচেতন মহল করছেন।
জানাযায়, চলতি মাসের ১২ তারিখে স্বাস্থ্য বিভাগের উপ-সচিব শারমিন আক্তার জাহানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেকে বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও ডাঃ মো.বাকির হোসেনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়। বদলি আদেশে আগামী ২০ মার্চের মধ্যে দুই পরিচালককে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নিদের্শনা প্রদান করা হয়। তবে এই দুই পরিচালককে বদলির বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যে সর্বমহলে গুঞ্জন উঠেছে।
সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে শেবাচিম হাসপাতাল ও কলেজের চিকিৎসকদের সাথে পরিচালক ডা. বাকির হোসেনের সম্পর্কের অবনতি ঘটছিল। কতিপয় চিকিৎসকরা পরিচালকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করে আসছিলেন। তবে ডা. বাকির হোসেন এসব অভিযোগের বিষয়ে ‘জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হলে চিকিৎসকদের প্রিয়ভাজন হওয়া যায়না’ বলে মন্তব্য করেছেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ডা. বাকির হোসেন শেবাচিম হাসপাতালে যোগদানের পর এখানে অনৈতিক উদ্দেশ্যে গঠিত কিছু সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেন। এছাড়া সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করা নিয়ে তিনি চিকিৎসকদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ ও জবাবদিহিতার মধ্যে আনার চেষ্টা করেন। আকস্মিক বদলি আদেশের সত্যতা নিশ্চিত করে ডা. বাকির হোসেন বলেন, ‘এভাবে বদলি আমিও চাইনি। কেন করা হল তা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। তবে সরকারি আদেশ মানতেই হবে’।

এবার আসা যাক খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে । খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাঃ এটিএম মঞ্জুর মোর্শেদ ২০১৭ সালের ২৮ জুন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন । দায়িত্বে আসার পর থেকে হাসপাতালটির শনির রাহুগ্রাস অনেকটা কাটতে শুরু করে। মঞ্জুর মোর্শেদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও সাহসি উদ্যেগে যোগদানের মাত্র ৭ দিনের মধ্যেই হাসপাতালটির চেহারা বদলে ফেলে। দালাল চক্র, সার্টিফিকেট বাণিজ্য, ওষধ চুরি সহ বিভিন্ন অপকর্মে বাঁধা হয়ে দাড়াঁন তিনি। অনেকটা শক্ত হাতে তিনি সকল অপশিক্তর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে হাসপাতালটি নিয়ম শৃংখলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
এছাড়া ২০১৯ সালের মে মাসে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রথম পরিচালক হিসেবে নতুন দায়িত্ব পান মঞ্জুর মোর্শেদ। পরিচালক হিসেবে নতুন দায়িত্ব এবং তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে পূর্বের অভিজ্ঞতা । এ দুটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে পুরো খুমেক হাসপাতালের চিত্র পাল্টিয়ে ফেলেন। শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের মতো তিনিও খুমেক হাসপাতালে কয়েকটি অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেন। ফলে একটি মহলের বাঁধা হয়ে দাঁড়ান মঞ্জুর মোর্শেদ। এর পর থেকে খুমেক হাসপাতালের এ পরিচালকের বিরুদ্ধে চলতে থাকে নানা ষড়যন্ত্রের নীল নকশা।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে স্বাচিপ (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ) এর একটি অংশের সাথে ডাঃ মঞ্জুর মোর্শেদ এর সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘটে। সব মিলিয়ে দুটি কারণ সামনে আসে মঞ্জুর মোর্শেদের বদলির পিছনে। এদিকে স্বাচিপের খুলনা জেলা সেক্রেটারী ডাঃ মেহেদী নেওয়াজ বলেন, “আমার জানামতে ডাঃ মঞ্জুর মোর্শেদের সাথে স্বাচিপের কোন অংশেরই কোন বিরোধ নেই, তার বদলি হয়েছে শুনেছি। তবে তিনি খুমেক হাসপাতালে অনেক উন্নয়ন করেছেন”। অপর দিকে স্বাচিপের খুলনা জেলার সভাপতি শামছুল আহ্সান (মাছুম) খুমেক পরিচালক ডাঃ মোর্শেদের সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। খুলনা বিএমএ’এর সভাপতি ডাঃ শেখ বাহারুল আলম বলেন , খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডাঃ মোর্শেদ শক্ত হাতে পরিচালনা করে আসছেন। তিনি আরও বলেন, চরম সংকটের মধ্যে দীর্ঘ দিন টিকে থাকায় ডাঃ মোর্শেদের বড় সফলতা।
খুমেক হাসপাতালের ইএমও ডাঃ তুষার কুমার পোদ্দার জানান, পরিচালক স্যারের আমলে বেশ কিছু ভাল কাজ হয়েছে। তিনি হাসপাতালকে গতিশীল করেছেন। সদ্য খুমেক হাসপাতালে যোগদানকৃত আরএমও ডাঃ মিজানুর রহমান বলেন, অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় বর্তমান পরিচালক স্যারের নেতৃত্বে হাসপাতালটি ভালভাবে চলছে।
নাসিং সুপার ভাইজার জেসমিন নাহার বলেন, চাকরি জীবনে মোর্শেদ স্যারের মত একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক এখন পর্যন্ত পায়নি।
বিদায়ী মুহুর্তে কথা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ এটি এম মঞ্জুর মোর্শেদের সাথে । তিনি জানান, সরকারি চাকরি বদলির চাকরি। বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বদলি হয়েছে। তবে খুমেক হাসপাতালের দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা নতুন কর্মস্থলে কাজে লাগিয়ে শেবাচিম হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মান আরো বৃদ্ধি করতে সক্ষম হবো। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরো বলেন, খুমেক হাসপাতাল নিয়ে আমার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন ছিল। অবশ্যই অনেকটা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে পরিবর্তন করতে পেরেছি।
খুমেক ও শেবাচিম হাসপাতলের দুই পরিচালেকর আকস্মিক বদলির বিষয় নিয়ে কথা হয় স্বাস্থ্য বিভাগের উপ-সচিব শারমিন আক্তার জাহানের সাথে। তিনি বলেন, দুই পরিচালকের সুনাম যথেষ্ট রয়েছে। দীর্ঘ দিন একই স্থানে দায়িত্বে থাকার কারণে বদলি হয়েছে। তবে এ বদলির পিছনে অন্যকোন বিশেষ কারণ বা উদ্যেশ্যে নেই।
সচেতন মহল মনে করেন, সারা দেশ যখন করোনা ভাইরাসের কারণে আতকে উঠেছে। ঠিক এ সময় কর্তৃপক্ষের এই দুই পরিচালককে বদলির বিষয় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সমীচিন হয়নি। তবে শের-ই বাংলা ও খুমেক হাসপাতালের অভিজ্ঞ এই দুই পরিচালককে স্ব-স্ব স্থানে দায়িত্বে রাখলে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রনে অনেকটা সহায়ক ভূমিকা থাকবে। কারন নতুন পরিচালক , নতুন হাসপাতালে দায়িত্বে আসলে সবকিছু বুঝে উঠতেই অনেক সময় লাগবে। তাই রদবদলের বিষয়টি স্থগিত করারও দাবি জানান সচেতন মহল।