যশোর জেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারী ক্লিনিকের জমজমাট ব্যবসা

জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা

51

যশোর জেলায় অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে ১শ’ ৫৭ টি বেসরকারি হসপিটাল ও ক্লিনিকের জমজমাট ব্যবসা

উৎপল ঘোষ(ক্রাইম রিপোর্টার) যশোর ঃ
যশোর জেলায় ১৭০ টি বেসরকারি হসপিটাল ও ক্লিনিক রয়েছে। সম্প্রতি ১৭০টির মধ্যে ১৩ টি প্রতিষ্ঠানের হাল নাগাদ লাইসেন্স পাওয়া গেছে। বাকিগুলো আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায় যা দেখার কেউ নেই। এ সকল ক্লিনিক ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সুত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি ১১টি হাসপাতাল ও ডায়ানগনষ্টিক বন্ধ করে দিয়েছেন কতৃপক্ষ। শিল্প বন্দর নগরীর নওয়াপাড়ার মমতাজ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মনিরামপুর উপজেলার প্রগতি সার্জিকাল ক্লিনিক,ঝিকরগাছা উপজেলার সালেহা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও যশোর শহরের ঘোপ জেলখানা রোডে বন্ধন হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলার সিভিল সার্জন আলী হাসান ও মেডিকেল অফিসার জুয়েলের নেতৃত্বে একটি টিম শহরে পরিদর্শনের সময় ৭ টি হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার অবৈধ ঘোষনা করেছেন।
এগুলো হলো ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের রেনেসাঁ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার,সেন্ট্রাল রোডের আধুনিক হসপিটাল, ল্যবজোন স্পেশালাইজিড হসপিটাল,কমটেক ডায়াগনষ্টি-  ক সেন্টার এন্ড হাসপাতাল,যশোর খাজুরায়  ফারিহা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, দেশ ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টার। বিষয়টি নিশ্চিত করে সিভিল সার্জন জানান, ঐ সকল প্রতিষ্ঠানের বন্ধের নির্দেশনা জারি করে নোটিশ দেয়া হবে। তিনি আরও বলেন,একাধিক হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার কালো তালিকাভূক্ত কাজ চলছে।
সিভিল সার্জন সুত্রে জানা গেছে, যশোর জেলায় মোট বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে ১৭০টি। এর মধ্যে ব্যাঙের ছাতার মতো  গজে উঠেছে বেশি সদর উপজেলায় ৬৮টি। অভয়নগরে ১৫ টি, মনিরামপুরে ১১টি, কেশবপুরে ১৫টি, ঝিকরগাছায় ২২টি, চৌগাছায় ৮টি, শার্শায় ২৪টি ও বাঘারপাড়া উপজেলায় ৭ টি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এর মধ্যে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে আশে পাশে গড়ে উঠেছে কমপক্ষে ৪২টি। ২০১৭ সালের পর থেকে যশোর জেলায় ৭০ টি প্রাইভেট  হাসপাতাল ও ক্লিনিক স্থাপিত হয়েছে। আর আনাচে কানাচের হিসাব আমাদের জানা নেই। খুব শীঘ্রই এগুলো খুঁজে বের করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিষ্ঠান মালিকরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে লাইসেন্সের জন্য অন লাইনে আবেদন করেই রোগীদের অস্ত্রপাচার চিকিৎসা সেবা ও পরীক্ষা নিরীক্ষাসহ সকল কার্যক্রম বীরদর্পে চালিয়ে যাচ্ছে। যা সরকারি নিয়ম বহির্ভূত। তাদের ইচ্ছামত স্ব – স্ব     নীতিমালায় চলছে এ সকল প্রতিষ্ঠানের জমজমাট ব্যবসা। কোন নিয়ম – কানুন ছাড়াই রোগীদের কাছ থেকে নিজেদের মতো করে ফি আদায় করছে তারা। একই ধরনের  প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য একেক প্রতিষ্ঠানে আদায় করা হয় একেক ধরনের ফি। এতে চরম বিপাকে পড়েন অসহায় রোগী ও স্বজনেরা। ঔষধের দামের বিষয়টি ইচ্ছামতো। ক্লিনিকের পাশে গড়ে উঠেছে ঔষধের দোকান।নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্য নেওয়ার অভিযোগ জানান ভূক্তভোগীরা। সরকারি নির্দেশ পাওয়ার পরও অধিকাংশ ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টারে রোগী পরীক্ষা – নিরীক্ষার নির্ধারিত ফি এর কোন তালিকা কোথাও টানানো নেই। কিছু কিছু  ক্লিনিকে হাতুড়ে পল্লী ডাক্তার দিয়ে পরিচালনার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সুত্র আরও জানায়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির জন্য ৩৭ ধরনের মাইক্রোবায়োলজি এন্ড ইউনোলজির জন্য ৪১,বায়োকেমিস্ট্রি ৪২, হিস্ট্রোপ্যাথলজি ৩, ড্রাগ এবিউজ ৮, থেরাপিউটিক ড্রাগ ৫,ও  ভাইরোলজির ২৩, ধরণের গ্রহণযোগ্য ফি প্রস্তাবিত করা হয়। ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির ক্ষেত্রে সর্বনিন্ম ৮০ ও সর্বোচ্চ ৬’শ টাকা, মাইক্রোবায়োলজি এন্ড ইমিউনোলজিতে সর্বনিন্ম ১৫০ ও ১৩০০ টাকা, বায়োকেমিস্ট্রিতে সর্বনিন্ম ১২০ টাকা ও সর্বোচ্চ ৮ ‘শ টাকা, হিস্ট্রোপ্যাথলিজিতে সর্বনিন্ম ৫’শ টাকা,সর্বচ্চ ১২’শ টাকা,ড্রাগ এবিউজে সব ধরণের পরীক্ষা ৫৫০ টাকা, থেরাপিউটিক ড্রাগের ক্ষেত্রে ৫০০ টাকা,ভাইরোলজির ক্ষেত্রে সর্বনিন্ম ২ শত টাকা ও সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা পযর্ন্ত ফি নির্ধারণ করা হয়। অথচ এরা কোন নিয়মকানুন মানছে না। যার যার খেয়ালখুশি মতো চলছে। মাঝে মাঝে রোগী ও স্বজনদের সাথে বাক বিতন্ডের ঘটনা ঘটতেও দেখা যায়। হাতুড়ে পল্লী ডাক্তারের সাথে থাকে অর্থ বানিজ্যর লেনদেন। অথচ এসব কিছুই মানা হচ্ছে না। প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সরকারের অনুমোদন নিয়ে খুলে বসা এসব প্রতিষ্ঠানে চলছে চিকিৎসার নামে রমরমা ব্যবসা। তাদের ফাঁদে পড়ে অনেকেই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। অনেক ডেলিভারি রোগী ও এপেনটিসাইট রোগী মৃত্যু হয়েছে।অপারেশন রোগীর পেটের ভিতর কাপড়ের গজ পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। হাতুড়ে টেকনিশান দিয়েই চালানো হয় রোগ নির্ণয়ের যাবতীয় পরীক্ষা এবং মনগড়া রিপোর্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার রয়েছে আরও গুরুত্বতর অভিযোগ। অধিকাংশ হসপিটাল ও ক্লিনিকে নিজস্ব কোন ডাক্তার নেই। বাইরে থেকেই ভাড়া করে আনা হয় ডাক্তার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক রোগী বলেন,সরকারি হাসপাতালে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তারগংরা ঠিকমতো রোগী দেখেন না বলেন,আমার চেম্বারে আসবেন। এমন শত শত অভিযোগ জানান ভূক্তভোগীরা। ভূক্তভোগীরা আরো জানান, নাম মাত্র একটি ঔষধ ধরিয়ে দিয়ে বলেন, বাকি ঔষধ বাইরে থেকে কিনে নেবেন।
ষশোরের সিভিল সার্জন ডাঃ দিলীপ রায় জানান,যশোর জেলায় মাত্র ১৩টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স রয়েছে।বাকিগুলো অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। অবৈধ হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হয়েছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান মালিক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কাছে লাইসেন্সের জন্য অন লাইনে আবেদন করেছেন। কিন্তুু এ সকল আবেদন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে সব ত্রুটিপূর্ণ। যে কারনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিদর্শনের জন্য তার কাছে আজ অবধি পযর্ন্ত কোন চিঠি আসেনি। সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন মনে না করেই এ সব রাঘব বোয়ালরা প্রতিষ্ঠান খুলে মাসে প্রায় লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সরকার রাজস্ব থেকে কোটি কোটি বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি বলেন,এ সব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। লাইসেন্স ব্যতিত কোন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেয়া হবে না। ইতিমধ্যে বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। যে কোন সময় ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
তিনি আরও জানান, শুধুমাত্র ২০১৭ সাল পযর্ন্ত যাবতীয় রাজস্ব পরিশোধ করে  যে সব হসপিটাল  ও ক্লিনিক যথাযথ অনুমোদন আছে সেইসব প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ থাকবে। আর যে সকল প্রতিষ্ঠান অনলাইনে আবেদন করেছেন সেগুলো যাচাই বাছাই করে তাদের তাগিদ দেয়া হবে এবং নির্ধারিত সময় বেধেঁ দেয়া হবে।
বিজ্ঞ মহল বলেছেন,এ সকল অবৈধভাবে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠা হসপিটাল ক্লিনিক ও ডায়াগনষ্টিক সেন্টার বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসকের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।