বাংলাদেশের বিশ্বকাপ জয়, ৩ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়লো

167

এই দিনটার জন্যই কি তবে অপেক্ষা ছিল কোটি বাঙালির! হোক না অনূর্ধ্ব-১৯ দল, ট্রফিটা তো বিশ্বকাপের। বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে। ভারত মানেই মনস্তাত্ত্বিক এক লড়াই। সেটা হোক বড় দলের কিংবা যুব দলের। সেই ব্যর্থতার বৃত্ত ভেঙে দিলো বাংলাদেশ। ভারত জুজু কাটিয়েই অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন হলো তারা। চারবারের চ্যাম্পিয়নদের ডাকওয়ার্থ লুইসে ৩ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়লো আকবর আলীর দল। যুব বিশ্বকাপের ট্রফি পেলো নতুন চ্যাম্পিয়ন ।

জয়ের জন্য ৫৪ বলে ১৫ রান দরকার বাংলাদেশের। স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে লড়ে যাচ্ছিলেন অধিনায়ক আকবর আলী আর রকিবুল হাসান।

ধীরে সুস্থে দলকে বিশ্বজয়ের বন্দরে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য তাদের। বাংলাদেশের সংগ্রহ তখন ৪১ ওভার শেষে ৭ উইকেটে ১৬৩। আকবর অপরাজিত আছেন ৪২ রানে। রকিবুল ১৯ বল খেলে করেছেন ৩। এমন একটা অবস্থায় বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ ছিল কিছুক্ষণ। বৃষ্টিতে ম্যাচের বাকিটুকু ভেসে গেলেও বৃষ্টি আইনে ১৬ রানে জিতে শিরোপা উঠতো আকবরদের হাতে। কিন্তু তার আর দরকার হয়নি। মিনিট দশেক পর বৃষ্টি চলে গেলে ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতিতে বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩০ বলে ৭। সেটাকে মামুলি বানিয়ে দলকে আকবরকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে শিরোপা জেতান রাকিবুল। ৪৩ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতেছেন অধিনায়ক আকবর আলী।

২০১২ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপের ফাইনালে হতাশ করেছিল সাকিব-তামিমরা। হাতের মুঠোয় থাকা শিরোপা ভারতের কাছে বাংলাদেশ খুইয়েছিল মাত্র ৫ রানে। মাস ছয়েক আগে যুব এশিয়া কাপের ফাইনালেও একই হতাশার চিত্র। ১০৬ রানে ভারতকে গুটিয়ে দিয়েছিল শামীম-মৃত্যুঞ্জয়রা। ওই ম্যাচেও ৫ রানে হারে যুবারা। যুব বিশ্বকাপের ফাইনালে মঞ্চে ছিল সেই ভারত। চারবারের চ্যাম্পিয়নদের ১৭৭ রানে গুটিয়ে দিয়ে প্রথম কাজটিও সহজ করে দিয়েছিল বোলাররা। লক্ষ্য ছোট। মাত্র ১৭৮ রানের। স্পর্শ করতে পারলেই লেখা হয়ে যাবে ইতিহাস। প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলবে বাংলাদেশ। সে লক্ষ্যে যুবাদের শুরুটা হয় বেশ ভালো। উদ্বোধনী জুটিতে ৫০ রান তুলে ফেলেছিলেন পারভেজ হোসেন ইমন ও তানজিদ হাসান। এর পরেই ছন্দপতন। ৫০ থেকে ৬৫ এই ১৫ রানেই চার উইকেট হারিয়ে বসে বাংলাদেশ। ১০০ পেরুতেই আরো তিন উইকেট নেই। তখনই জুজুর ভয় পেয়ে বসে টাইগার সমর্থকদের। ভেসে আসে হতাশার সে চিত্র। সেই চিত্র ভোলানোর দায়িত্ব কাল নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক আকরব আলী।

উদ্বোধনী জুটিতে পারভেজ হোসেন ইমন ও তানজিদ হাসান গড়েন পঞ্চাশ রানের জুটি। তবে এর পরপরই বিদায় নিয়েছেন তানজিদ। তানজিদকে বিদায় করেন ভারতীয় লেগ স্পিনার রবি বিষ্ণু। এরপর এই লেগ স্পিনারের একে একে কাটা পরেন আগের ম্যচের সেঞ্চুরিয়ান মাহামুদুল হাসান জয় ও তৌহিদ হৃদয়। ৬২ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পরে বাংলাদেশ। সেখান থেকে দলকে টেনে তোলার দায়িত্ব নেন আকবর আলী। ৬৫ রানে শাহাদাত হোসেনকে স্ট্যাম্পিংয়ের ফাঁদে ফেলেন বিষ্ণু। আকবর আলীর সঙ্গে তিথু হওয়ার আগেই অযথা শট খেলতে গিয়ে মিশ্রার বলে জসওয়ালের হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন শামীম হোসেন। ৮৫ রানে পঞ্চম ব্যাটসম্যান হিসেবে কাটা পরেন এই অলরাউন্ডার। চরম বিপর্যয়ে, ভীতি জাগানিয়া পরিস্থিতিতে খেলছিলেন কেবল আকবর। অলরাউন্ডার অভিষেককে একপাশে নিয়ে ১৭ রানের জুটি এসে গিয়েছিল। লো স্কোরিং ম্যাচে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানো অবস্থায় জাগছিল আশা।

কিন্তু স্লিপে ক্যাচ দিয়ে জীবন পাওয়ার পরের বলেই ক্যাচ উঠিয়ে ৫ রান করে ফেরেন অভিষেক। তার আউটে ক্রিজে ফেরেন চোটে বেরিয়ে যাওয়া পারভেজ। এরপরই ফের বদলে যায় ম্যাচের মোড়। দৃঢ়তার সঙ্গে খেলতে থাকা আকবরের সঙ্গে পারভেজ যোগ দিয়ে যোগান ভরসা, আসে রান, বাড়ে আশা। অধিনায়ক আকবর রাখেন বড় ভূমিকা। পুরো পরস্থিতি পড়ে ঠান্ডা মেজাজে চালাতে থাকেন ব্যাট। পারভেজ পায়ে ক্র্যাম্প নিয়ে বের করতে থাকেন বাউন্ডারি। ক্রমেই জয়ের কাছে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। জুটি বাড়ছিল, জেতার জন্য প্রয়োজনীয় রানের চাহিদা ৪০ এর নিচে নেমে আসছিল। কিন্তু নাটকের বাকি ছিল আরও। আকবরের সঙ্গে ৪১ রানের জুটির পর ফিফটির দিকে থাকা পারভেজের বিদায়। অনিয়মিত লেগ স্পিনার জওসওয়ালের বলে অযথা পেটাতে গিয়ে মিড অফে দেন ক্যাচ। ফের তৈরি হয় আশা-নিরাশার দোলাচল। আকবর তখনো অবিচল। রকিবুল হাসানকে নিয়ে প্রথমে ঠাণ্ডা করলেন পরিস্থিতি, বেশ কিছুটা সময় নিলেন না রান। আকাশে তখন ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা। ডি/এল মেথডের হিসাবটাও মাথায় রাখতে হচ্ছিল তাকে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টিও নামল এক সময়। খেলা বন্ধ থাকল ২০ মিনিট। ডি/এল মেথডে বাংলাদেশের লক্ষ্য নেমে আসে ৩০ বলে ৭ রানে। ওই রান ২৩ বল হাতে রেখেই নিয়ে নেয় বাংলাদেশ।

গতকাল বোলিংটা দুর্দান্ত করেছেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বোলাররা। শরিফুল ইসলাম শুরু করেছিলেন। তানজীম হাসান সাকিব, অভিষেক দাস, রকিবুল হাসান, শামীম হোসেন সবাই ছিলেন দারুণ। বোলিংয়ের সঙ্গে ফিল্ডিংটাও ছিল দুর্দান্ত। ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা সত্যিকার অর্থে সুযোগই পাননি হাত খুলে খেলার। এরমধ্যেও ওপেনার যশস্বী জয়সোয়াল একাই লড়ে যাচ্ছিলেন এক দিক ধরে রেখে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের আঁটসাঁট বোলিংয়ের মধ্যেও তিনি খেলেছেন নিজের খেলাটাই। এবারের যুব বিশ্বকাপে ভারতের সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান তিনি। ব্যক্তিগত ৮৮ রানে তাঁকে তানজীদ হাসানের ক্যাচ বানিয়ে ফিরিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। এই শরিফ ১০ ওভার বোলিং করে ৩১ রান দিয়ে তুলে নিয়েছেন ২ উইকেট। যশস্বী জয়সোয়াল ফিরেছেন ১২১ বলে ৮৮ রান করে। ভারতের পক্ষে দ্বিতীয় সেরা সংগ্রহ তিলক বার্মার। তিনি ৬৫ বলে করেছেন ৩৮। জয়সোয়াল যখন ফেরেন, তখন ভারতীয় দলের সংগ্রহ ১৫৬/৩। তারা শেষ ৭ উইকেট হারায় মাত্র ২১ রানে। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্য শরিফুল ছাড়াও দুর্দান্ত ছিলেন তানজীম হাসান। ৮.২ ওভারে ২৫ রান দিয়ে ২ উইকেট নিয়েছেন তিনি। নিজের প্রথম দুই ওভারই মেডেন দিয়ে শুরু করেছিলেন তিনি। অভিষেক দাস উইকেটের দিক দিয়ে সবচেয়ে সফল। তিনি ৪০ রানে নিয়েছেন ৩ উইকেট। বাঁ হাতি স্পিনার রকিবুল হাসান নিয়েছেন এক উইকেট।