খুলনার-ফুলতলার ঐতিহ্যবাহী গামছা শিল্প আজ মৃতপ্রায়

164
মোঃ আল আমিন খান, খুলনা ব্যুরো।।
সকাল হলেই শুরু হয় ঠক ঠক শব্দ। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সাংসারিক কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিপুণ হাতে গামছা তৈরি করেন কারিগররা।দামোদর বণিকপাড়া গ্রামের এক কারিগর এর সাথে কথা বলে জানা যায়, গামছা তৈরি করে সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে তার এ প্রচেষ্টা। কিন্তু কাঁচামাল ও উপকরণের মূল্য বাড়ায় ও সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কষ্ট করে গামছা বুনেও সংসারে ফিরছে না সচ্ছলতা। অতি লোকশানের কারনে কেউ গামছা বুনতে চায় না। কয়েকটি পরিবার দায় ঠেকে কষ্ট করে যাচ্ছে। গামছা তৈরির জন্য ব্যবহৃত সুতা ও রঙের মূল্য বেড়েছে। সেসঙ্গে শ্রমিকের মজুরিও বেশি দিতে হয়। গামছার দাম দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে গামছা বুননের কাজ না করে অনেকে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। একটি গামছা তৈরি করতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। ফুলতলার ঐতিহ্যবাহী গামছা শিল্প আজ মৃতপ্রায়। এক সময় এখানের পাঁচটি গ্রামের শতভাগ পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস ছিল এ শিল্প। দিন দিন নিঃস্ব হয়ে পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে থাকা জড়িতরা। বন্ধ হয়ে গেছে এলাকার ৯০ শতাংশ তাঁত শিল্প। গামছা বুননের কাজ করলে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচসহ দৈনন্দিন জীবনে ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয় কারিগরদের।
সরকারি সহযোগিতা ও কোন সংস্থা থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পেলে তাঁতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন তাঁতীরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, ফুলতলা উপজেলার দামোদর, গাড়াখোলা, জামিরা, আলকা, টোলনা, গ্রামে এখন আর আগের মতন তাঁতের ঠক ঠক শব্দ শোনা যায় না। আধুনিকতার ছোঁয়া আর গামছা তৈরির প্রধান উপকরণ সুতা, রঙের অত্যাধিক মূল্য বৃদ্ধি ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিবর্তে লোকসান গুণতে হচ্ছে তাঁতীদের। অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে গামছাপল্লির ৯০ শতাংশ তাঁত। আর যে কয়েকটি পরিবার টিকে আছে তাও বন্ধের উপক্রম হয়েছে। আগের মতন বাড়ির আঙিনায় চরকায় রঙবেরঙের সুতা গুটিতে গুছিয়ে দেওয়া দৃশ্য এখন আর নেই বললেই চলে। এ পেশা টিকে থাকা অনেকেই বলেন, লাভ বেশি না হওয়ার কারণে অনেক তাঁতী গামছা বোনা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় চলে গেছেন। অন্যদিকে মেশিনের তৈরি গামছার দাম কম হওয়ায় হাতে বোনা গামছার চাহিদাও কমেছে। তারা বলেন, স্থানীয় ফুলতলা বাজারে হাটের দিন গামছা বিক্রি করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অর্ডার পেলে গামছা তৈরি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গামছাপল্লির তাঁতীরা জানান, ভালো সবচেয়ে বড় গামছা (তিন ফুট চওড়া ও চার হাত লম্বা) ২শ টাকা পিস। দু’এক ইঞ্চি ছোট পরেরটা ১২৫ টাকা পিস। সাড়ে তিন হাত লম্বা চওড়া এক গজ ৮০ টাকা পিস। এখানকার তাঁত ও তাঁতীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্পটি। তাই এখন এই শিল্পকে জাগিয়ে তুলতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। তাদের সহযোগিতায় এই শিল্প আবার ফিরে পেতে পারে তার পুরনো ঐতিহ্য এবং সেই সঙ্গে তাঁতীরাও আবার ফিরে আসতে পারেন।খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বতমান এমপি বাবু নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ফুলতলার গামছার ঐতিহ্য রয়েছে। এর কদর রয়েছে দেশজুড়ে। গামছা শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কিছুটা পিছিয়ে যাচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। অনতিবিলম্বেে এই সমস্যার সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি।