অস্ত্র নিয়ে কিভাবে প্রবেশ করলো ছিনতাইকারী- সংসদে প্রশ্ন

665

বিমান হাইজ্যাক চেষ্টার ঘটনা তদন্তে সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের সর্বদলীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে জাতীয় সংসদে। একইসঙ্গে যাত্রীদের নিরাপদে অবতরণ এবং সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলার স্বীকৃতি হিসেবে ওই বিমানের পাইলট, কো-পাইলট ও ত্রুদের বিশেষভাবে পুরস্কৃত করার পাশাপাশি কীভাবে ছিনতাইকারী অস্ত্র নিয়ে বিমানে প্রবেশ করতে পারলো সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। সংসদে মাগরিবের বিরতির পর স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পর সংসদের বৈঠক আবার শুরু হলে প্রথমে কার্যপ্রণালী বিধির ৩০০ বিধিতে সংসদে এ বিষয়ে বিকৃতি দেন বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী মাহবুব আলী।

এরপরে পয়েণ্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী বিষয়টির অবতারণা করে বলেন, এইভাবে কোনো ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে বিমানে ঢুকতে পারে না। সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ সেখানে কি করে? বিষয়টিকে আমরা সহজভাবে নিতে পারি না। উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যেন ভবিষ্যতে আর এই ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। সরকারিভাবে যদি তদন্ত হতে হয় তাহলে অন্তত সচিবের নিচে কাউকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা উচিত হবে না।

কেননা বিমানের সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি ও জাতির সুনাম জড়িত।

সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সর্বদলীয় তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে এই সংসদকে বিস্তারিত জানাতে হবে। নইলে মানুষ এই বিমানে আর উঠবে না, বিমান লোকসানে যাবে। এরপর ফ্লোর নিয়ে বাংলাদেশ জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইন উদ্দীন খান বাদল বলেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনে দেখলাম বলা হয়েছে আমি নাকি ওই বিমানের যাত্রী ছিলাম। আমি ওই বিমানের যাত্রী ছিলাম না। চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে আমি ওই বিমানবন্দরে এসেছিলাম ঢাকায় ফেরার জন্য। সেখানে তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুরও উপস্থিত ছিলেন।

আমরা দু’জন সিদ্ধান্ত নিলাম, সংসদ সদস্য হিসেবে বিষয়টি তদারকি করা আমাদেরও কর্তব্য। এজন্য আমরা একেবারে টারমার্কে ঢুকে পড়ি এবং একেবারে শেষ পর্যন্ত সেখানে থাকি। নিজের দেখা ঘটনা ও পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য বাদল বলেন, আমার ফাইন্ডিং হল- একজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি বিমানে পেছন দিক থেকে গালাগালি করতে করতে সামনে দিকে আসতে থাকে। সে পাইলটকে দরজা খুলতে বলে। পাইলট দরজা খুলেননি। পত্রপত্রিকায় লেখা হয়েছে পাইলটের সঙ্গে অনেককিছু হয়েছে। না, পাইলটের সঙ্গে মল্লযুদ্ধ হয়নি। পাইলট তার সঙ্গে কথা বলে তাকে ব্যস্ত রাখার কৌশল নেন।

পাইলট অত্যন্ত দূরদর্শিতা ও সাহসের সঙ্গে বিমান অবতরণ করেন। বিমানের ক্রুদেরও পরিস্থিতি মোকাবেলায় সাহসী ভূমিকা ছিল। ক্রুরা ইকোনমি ও বিজনেস সিটের মাঝখানে পর্দা লাগিয়ে দেন। বিমানটি অবতরণের পর বিমানের ডানার পাশে থাকা জরুরি নির্গমণ পথ দিয়ে যাত্রীদের বের করে আনা হয়। পরে পাইলট যখন বেরিয়ে আসেন তার সঙ্গে আমার কথা হয়। পাইলট বললেন, ভেতরে ওই ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ নেই, এখন অপারেশন চালানো যায়। পরে সেনা কমান্ডো অফিসার আমাকে জানান, ভেতরে ওই ব্যক্তি অফেসনিভ নিয়েছে, যার কারণে তার সঙ্গে আমাদেরকে নেগোসিয়েশনে যেতে হয়েছে।

এরপর অপারেশনে ওই ব্যক্তি আহত হওয়ার পর মারা যায়। মইন উদ্দীন খান বাদল আরও বলেন, এদেশে রিয়েল হিরোরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান না। পাইলট, কো-পাইলট ও ক্রুরা অসীম সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাবো, তাদেরকে পুরস্কৃত করা উচিত। অপারেশন শেষ করে মাত্র ২ ঘণ্টা ৩২ মিনিটের মাথায় বিমানবন্দর আবার চালু করে দেওয়া হয়েছে। এখানে বোঝা যায়, এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করে দ্রুত বিমানবন্দর খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের পারদর্শিতা অর্জিত হয়েছে। একইসঙ্গে চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাহসী ভূমিকার জন্য ফায়ার ব্রিগেডের সংশ্লিষ্ট সদস্যদেরও পুরস্কৃত করতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে, রুস্তম আলী ফরাজী ও বাদলে বক্তব্যের আগে কার্যপ্রণালী বিধি ৩০০ বিধিতে সোমবার সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে বলেন, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ৫টা ১৩ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম-দুবাইগামী বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৪৭ ঢাকা বিমানবন্দর ত্যাগ করে। তবে চট্টগ্রামে অবতরণের আগে বিমানে যাত্রী বেশে একজন আকস্মিক ব্যক্তি যাত্রীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বিমান উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ও চিৎকার করতে থাকে। বিমানের কর্তব্যরত ক্যাপ্টেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা, পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে দুস্কৃতিকারীর কথপোকথনে ব্যস্ত করে কালক্ষেপণ করে ইতোমধ্যে বিমানের ক্রুদের সহায়তায় সকল যাত্রীদের নিরাপদে বের করে নিয়ে আসা হয়।

তিনি বলেন, ঘটনা চলাকালে বিমান বাহিনীর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফায়ার সার্ভিসসহ সকল সংস্থার তড়িৎ ব্যবস্থার ফলে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপদ স্থানে নিতে সক্ষম হয়। সেনাবাহিনী কমান্ডো ও র‌্যাবের একটি চৌকস দল বিমানবন্দরে অবস্থান গ্রহণ করে। কমান্ডো দল বিমানের ভেতরে প্রবেশ করে এবং ঝটিকা আক্রমণ করে দুস্কৃতিকারীকে নিস্ক্রিয় করে। এক পর্যায়ে কমান্ডো বাহিনীর দুর্বার অভিযানে ছিনতাইকারী আহত হয়ে পরে মৃত্যুবরণ করে। বিমানটিতে ১৪৮ জন যাত্রী ও ৭ জন স্ক্রু সকলেই নিরাপদে আছেন। বিমানটিও অক্ষত রয়েছে। বেবিচক পর্যটন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে।