সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ দিচ্ছে প্রশিক্ষণহীন বিপুলসংখ্যক শিক্ষক

601

বিশেষ প্রতিনিধি :

দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসায় বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক পাঠদান করছে। যদিও শিক্ষকতার চাকরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক নয়। তবে সরকারি শিক্ষকদের বেলায় চাকরিতে যোগদানের ৫ বছরের মধ্যে বিএড প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক। বিএড প্রশিক্ষণ থাকলে সরকারি শিক্ষকরা ১০তম গ্রেডে যোগ দিয়ে অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্ট পান। আর বেসরকারি শিক্ষকদের বিএড প্রশিক্ষণ থাকলে ১১তম গ্রেড থেকে ১০তম গ্রেডে উন্নীত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৪) বাস্তবায়নে দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের কথা সরকার বললেও শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ক্লাসরুমে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন বিএড এবং মাদরাসার ক্ষেত্রে বিএমএড সমমানের প্রশিক্ষণ ছাড়াই এক লাখ ৫৮ হাজার ৭২২ জন শিক্ষক। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদরাসার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি শিক্ষকের ওই প্রশিক্ষণ নেই। তার মধ্যে ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের হার সবচেয়ে কম। ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা ওসব শিক্ষককে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার যোগ্যতা হিসেবে বিএড প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়াতে বিএড প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কারণ শিক্ষকদের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ না থাকায় যেসব ছোটখাটো প্রশিক্ষণ তারা পাচ্ছেন, তাতে ঠিকমতো আত্মস্থ করতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থীরাও সৃজনশীলে দক্ষ হতে পারছে না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের এক একাডেমিক সুপারভিশনে দেখা যায়, ৫৭.২৮ শতাংশ শিক্ষক নিজেরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন। আংশিক প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন ২৬.২৭ শতাংশ শিক্ষক। আর বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করেন ১৬.৪৫ শতাংশ শিক্ষক। অর্থাৎ ৪২ শতাংশ শিক্ষক নিজেরা সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন করতে পারেন না। সূত্র জানায়, বিভিন্ন প্রকল্প এবং মাউশি অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখার আওতায় সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত কতজন শিক্ষক সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছেন তার হিসাব কারো কাছে নেই। তবে বিভিন্ন প্রকল্প থেকে স্থানীয় পপ্রশিক্ষণ খাতে পরীক্ষা পদ্ধতি উন্নয়ন বিষয়ে ২ লাখ ২৪ হাজার শিক্ষকের প্রশিক্ষণ চলমান রয়েছে। তাছাড়া ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৬০ হাজার ৭৭০ জন শিক্ষককে সৃজনশীল বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রথম দিকে শিক্ষকদের ৩ দিনের সৃজনশীল প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও বর্তমানে দেয়া হয় ৬ দিন। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যানুযায়ী দেশের সরকারি এবং এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় শিক্ষকসংখ্যা ৪ লাখ ৩১ হাজার ৮২২ জন। তার মধ্যে বিএড প্রশিক্ষণ নেই এক লাখ ৫৮ হাজার ৭২২ জন শিক্ষকের। তার মধ্যে রয়েছেন এক লাখ ২৮ হাজার ৪৭৩ জন পুরুষ ও ৩০ হাজার ২৪৯ জন নারী শিক্ষক। পরিসংখ্যানে আরো দেখা গেছে, ৩০ বছর বয়সী প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকের সংখ্যা ৪ হাজার ৯৮ জন, ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী শিক্ষক ৬০ হাজার ২৮১ জন, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সী শিক্ষক ৬১ হাজার ৮৭ জন এবং ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী শিক্ষক ৩০ হাজার ২৫৬ জন। আর প্রশিক্ষণবিহীন ওসব শিক্ষকের মধ্যে বেশির ভাগই মাদরাসার। দাখিল ও আলিম মিলিয়ে এক লাখের বেশি এমপিওভুক্ত মাদরাসা শিক্ষক রয়েছেন। যাদের বেশির ভাগের বিএড বা সমমানের ডিগ্রি নেই। সর্বোচ্চ ১০ হাজার শিক্ষকের বিএড পর্যায়ের ডিগ্রি রয়েছে। কয়েক বছর আগে মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তর গঠিত হলেও শিক্ষকদের মান উন্নয়নে তারা এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। সূত্র আরো জানায়,এক লাখ ৫৮ হাজার ৭২২ জন শিক্ষককে বিএড প্রশিক্ষণ দিতে ব্যয় কত হবে, সময় কত লাগবে, প্রতি ব্যাচে কতজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন, সময়ের দিক থেকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পদ্ধতি কেমন হবে ওই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে সম্প্রতি ব্যানবেইসকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। শিগগিরই এ নিয়ে সভা ডাকা হবে এবং সেখানে প্রশিক্ষণের পদ্ধতি চূড়ান্ত করা হবে। প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকদের কমপক্ষে এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তবে ৫২ বছরের বেশি বয়সী শিক্ষকদের জন্য সংক্ষিপ্ত কোর্সের আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষকে (এনটিআরসিএ) শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিএড বা ন্যূনতম এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ এবং ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারে প্রস্তাব করা হবে। এদিকে এ প্রসঙ্গে মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম ছায়েফ উল্যাহ জানান, মাদ্রাসা বোর্ড বাংলাদেশ মাদরাসা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (বিএমটিটিআই) মাধ্যমে শিক্ষকদের ব্যাচেলর ইন মাদরাসা এডুকেশন (বিএমএড) করার সুযোগ করে দিয়েছে। খুব স্বল্প খরচে শিক্ষকরা এখান থেকে এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষক বিএমএড করেছেন। তবে অনেকেরই আগ্রহ কম। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক বিএড বা সমমানের ডিগ্রি গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হলে সবাই বাধ্য হতেন। অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে মাউশি অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ শাখার পরিচালক প্রফেসর ড. আব্দুল মালেক জানান, অনেক শিক্ষকেরই বেসিক প্রশিক্ষণ না থাকায় তারা তা আত্মস্থ করতে পারেন না। ২০৩০ সালের মধ্যে সব শিক্ষকের এক বছর মেয়াদি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা হবে। বর্তমানে যাদের প্রশিক্ষণ নেই জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে (টিটিসি) যাতে শিক্ষকরা প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার পান সে বিষয়েও আলোচনা চলছে। তাছাড়া এনটিআরসিএ যাতে বিএড প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেয় সে ব্যাপারেও তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।