শ্রমিক বিক্ষোভ চতুর্থ দিনে, সাভার-গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন

1087

মজুরি পুনঃনির্ধারণ ও বেতন বৈষম্য দূর করার দাবিতে গতকাল চতুর্থদিনের মতো বিক্ষোভ করেছেন গার্মেন্ট শ্রমিকরা। রাজধানীসহ সাভার, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জে এ বিক্ষোভ হয়। দফায়-দফায় শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে পুলিশের। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়ক ও বিশমাইল-জিরাবো সড়ক অবরোধ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ  করতে লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে পুলিশ। এতে শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুর এলাকায় আট প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়ও রাজধানীর মিরপুরের কালশি এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা।

বিক্ষোভ চলাকালে সড়কগুলোতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিটি সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে।

সকালে মিরপুর-পল্লবী এলাকার শ্রমিকরা কালশি সড়কে জড়ো হন। ন্যায্য বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবিতে তারা স্লোগান দিতে থাকে। এসময় ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলেও শ্রমিকরা সড়ক ছাড়েননি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ওই সময়ে শ্রমিকরা জানান, তারা দাবির বিষয়ে মালিকপক্ষের বক্তব্য শুনতে চান।  দুপুর ১টার পরে পোশাক মালিকরা সেখানে গিয়ে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে আশ্বস্ত করে তাদের ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। পল্লবী থানা পুলিশ জানায়, দুপুরের পর শ্রমিকরা সড়ক থেকে সরে যায়।

গতকাল বিক্ষোভ করেছে শিল্পাঞ্চল সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়ক ও বিশমাইল-জিরাবো সড়ক অবরোধ করে। এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদেরকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকরা। পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, জলকামান ও লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল ৮ টা থেকে শুরু করে দুপুর দুইটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই পরিস্থিতিতে প্রায় ২০টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানায়, বেতন বৈষম্য রোধের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে বিক্ষোভ করছেন তারা। বুধবার সকাল ৮টায় সাভারের উলাইল এলাকার স্ট্যান্ডার্ড স্টিচেস লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে গেলে প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণার নোটিশ দেখতে পান। কারখানাটির সুইং অপারেটর আল-আমিন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করতে  গেলে কর্তৃপক্ষ আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। উল্টো কারখানার ভাড়াটে লোকজন দিয়ে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানাটিতে ভাঙচুরের চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ সদ্যদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

একই দাবিতে সকাল থেকেই গেণ্ডা এলাকার আলমুসলিম গ্রুপের প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করে। কিন্তু মালিকপক্ষ দাবির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দেয়ায় সকাল ৯টার দিকে সকল শ্রমিক একযোগে কারখানা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহসড়কে অবস্থান নিলে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সড়কটিতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে বিজিবি মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ সময় পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল, জলকামান ও লাটিচার্জ করে। শ্রমিকরা পিছু হটলেও পরবর্তীতে গেণ্ডা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে তারা সড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে পুলিশ শ্রমিকদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলে তারা সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করে। সকাল ৮ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত দফায় দফায় সড়ক অবরোধ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত অর্ধশত শ্রমিক আহত হয়। আল-মুসলিম গ্রুপের নারী শ্রমিক মালেকা বলেন, নতুন মজুরি কাঠামোতে হেলপারদের তিন হাজার টাকা বাড়লেও অপারেটরদের বেড়েছে মাত্র একহাজার টাকা। এটা বৈষম্য। এই বৈষম্য রোধ করার দাবি জানান তারা।

একই দাবিতে আশুলিয়ার কাঠগড়া, আমতলা, জামগড়া, নরসিংহপুর, ঘোষবাগ, নিশ্চিন্তপুর, সরকার মার্কেট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক সানা শামিনুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা মজুরি কাঠামোর বিষয়টি পর্র্যালোচনা করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি জলকামান ও সাঁজোয়াযানের মহড়া অব্যাহত আছে বলে জানান তিনি।

গাজীপুর থেকে জানাযায়, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার পোশাক শ্রমিকরা সকাল থেকেই বিক্ষোভ শুরু করে। ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক বার বার অবরোধ করে শ্রমিকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময়  কমপক্ষে ২০ জন আহত হন। সংঘর্ষের সময় দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় দুই সাংবাদিকের ওপরও হামলা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। মহানগরের কোনাবাড়ী, চান্দনা চৌরাস্তা, কাশিমপুরসহ শিল্প এলাকা গুলিতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। একইসঙ্গে বিজিপি সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোক্তার হোসেন জানান, সকালে সিটি করপোরেশনের নাওজোড়, কড্ডা, ভোগড়া বাইপাস এলাকার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

টঙ্গী থেকে জানাযায়, গতকাল সকাল ৯টার আগেই টঙ্গীতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার শ্রমিক। এ সময় শ্রমিকদের আন্দোলনে হামলায় চালায় মালিকপক্ষের লোকজন। এতে দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ের মালিক পক্ষের লোকজন পিছু হটলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা গার্মেন্টে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় কারখানার নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পরিস্থিতি শান্ত হলে গাজীপুর মহানগর পুলিশ (জিএমপি) কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

ধামরাই থেকে জানাযায়, ধামরাইয়েও ব্যাপক বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। একপর্যায়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় প্রায় একঘণ্টা যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে খবর পেয়ে ধামরাই থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। শ্রমিকরা জানান, ধামরাইয়ের জয়পুরায় অবস্থিত নাফা অ্যাপারেলস পোশাক কারখানায় প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করছেন। সম্প্রতি জুনিয়র শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হলেও সিনিয়র শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়নি। এছাড়া নতুন মজুরি কাঠামোতে  বৈষম্য রয়েছে। তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগ দেবেন না বলে জানান তারা।

নারায়ণগঞ্জ থেকে জানাযায়, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দু’টি পোশাক   কারখানার শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধি ও বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেছে। খবর  পেয়ে থানা ও শিল্পাঞ্চল পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের বিষয়টি সমাধানের আশ্বস্ত করা হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়।